আইয়ামে জাহিলিয়াত
আইয়ামে জাহিলিয়াত শব্দের বাংলা অর্থ অজ্ঞতার যুগ, আত্ন অহংকারের যুগ, আত্ন গরিমার যুগ, ঠাট্টা বিদ্রুপের যুগ,উপহাসের যুগ, জোর যার মুল্লুক এই নিয়মের যুগ, মুর্খতার যুগ বা তামাশার যুগ। এই ঘৃণ্য সমাজ ব্যবস্থা ছিল আরবের মক্কায়।
মক্কার লোকেরা ভাবত তারা সবচেয়ে সেরা।সবার চেয়ে উন্নত। পৃথিবীতে একমাত্র তারাই সভ্য এবং উন্নত সংস্কৃতির অধিকারী।তারা নিজেদেরকে সবসময় সঠিক মনে করত এবং যা করত তা সব ভালো মনে করত। তারা নিজেদের কে স্রষ্টার প্রতিনিধি মনে করত।
সকল প্রকার মন্দ কাজকে তারা দিয়ে ছিল বৈধতা। তখনকার লোকেরা ছিল মন্দ থেকে মন্দ। তারা কোন ধরাবাঁধা নিয়মের অনুসারী ছিলনা। ছিলনা কোন প্রাতিষ্ঠানিক আইন। সর্বদা জোর যার মুল্লুক এই নিয়মেই চলত তখনকার সকল কর্মকান্ড। শেখের আদেশ ছিল চুড়ান্ত আইন। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা বা আল মালা।
আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময়কাল নিয়ে অনেক ঐতিহাসিকের মধ্যে মত বিরোধ আছে। অনেকে মনে করেন হযরত আদম থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে আইয়ামে জাহিলিয়াত বলে। অনেকের দাবি ইসা (আ) তিরোধানের পর থেকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নওবুয়াত প্রকাশ পাওয়ার মাঝখানের এই সময়টাই আইয়ামে জাহিলিয়াত। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ৫১০ সাল থেকে শুরু করে ৬১০ সাল পর্যন্ত সময়কে আইয়ামে জাহিলিয়াত বলে মনে করেন।
আইয়ামে জাহিলিয়াতের কিছু বৈশিষ্ট্য সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি।
কাসিদা প্রাথাঃ আইয়ামে জাহিলিয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কাসিদা প্রথা। কাসিদা প্রথা হলো কেউ একজন কারো কাছ থেকে সুদে টাকা নিল কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ করতে নাপারত তখন মহাজন খাতকের কাছে থেকে তার স্ত্রী সন্তান সব নিয়ে নিত এবং দাসে পরিনত করত।
সুদ প্রথাঃ আইয়ামে জাহিলিয়াতের আরো একটি উল্লেখ যোগ্য সুদ। তখনকার সময়ে চক্রবৃদ্ধি সুদ প্রচলিত ছিল। যা মানুষকে গরিব থেকে গরিবে পরিনত করত। সর্বশেষ একটা মানুষকে দাসে পরিনত করত।
কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়াঃ আইয়ামে জাহিলিয়াতের আরো একটি জঘন্যতম প্রথা ছিল কন্যা সন্তানকে জীবন্ত মাটিতে দাফন করে ফেলা। এটাকে তারা কোন অন্যায় মনে করত না। বরং এটাতে তারা গৌরব বোধ করত।
আল দিয়াতঃ আইয়ামে জাহিলিয়াতের আরো একটি বৈশিষ্ট্য ছিল আল দিয়াত। আল দিয়াত হলো মুক্তিপণ বা ব্লাড মানি। আরবে প্রচলিত ছিল হত্যার বদলে হত্যা। কানের বদলে কান। চোখর পরিবর্তে চোখ। কিন্তু কেউ যদি ক্ষতি পূরণ দিতে চাইতো তাহলে তা দিতে পারত।
পেশাঃ তখন তাদের প্রধান পেশা ছিল পশু পালন, ব্যবসা ও ছিনতাই। ছিনতাই করা ছিল গর্বের বিষয়। যে যত বেশি নিপুন হাতে ছিনতাই করতে পারত সে তখন সবচেয়ে বড় মাপের সম্মানি মানুষ ছিল।
সাহিত্যঃ আইয়ামে জাহিলিয়াতের আরো একটি বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের সাহিত্য। তারা খুব উন্নত মানের সাহিত্য রচনা করত। তাদের সাহিত্যের বিষয় বস্তু ছিল যুদ্ধ নারী মদ জুয়া এবং বিভিন্ন গোত্রের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে সাহিত্য রচনা। তাদের সময়ে কবিদের খুব কদর ছিল। যদি কোন গোত্রে কবি না থাকত তাহলে তারা অন্য কোন গোত্র থেকে কবি এনে কবিতা গাইত। যুদ্ধের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করত কবিদের কুরুচিপূর্ণ কবিতা। নিজ গোত্রের বীর বাহাদুরদের কর্ম স্বরণ করে কবিতা আবৃত্তি করা হত। উকাজ মেলায় তারা কবিতা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করত। যে কবিতা গুলি সেরা হত সেগুলো তারা কাবার ঘরে ঝুলিয়ে দিত। এ কবিতা গুলিকে "সাব অ মুয়াল্লাকা" বা ঝুলন্ত সাতটি কবিতা বলা হত।
যুদ্ধঃ আইয়ামে জাহিলিয়াতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল গোত্রে গোত্রে লড়াই। অযথা তারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দিত। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আইয়ামে জাহিলিয়াতে প্রায় ১৭০০ যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধের ব্যয় ভার বহন করার জন্য তারা বিভিন্ন গোত্রে এবং বণিক কাফেলায় আক্রমণ চালাত।যুদ্ধে যারা পরাজিত হত তাদেরকে দাস বানিয়ে রেখে দিত। তাদের নারী কে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হত। তারা যুদ্ধে জয়ী হলে উল্যাস করত মাতাল হয়ে । বিপক্ষ লোকের নেত্রীস্থানীয় কোন মানুষ হলে তারা আরো বেশি হিংস্র আচরণ করত। নাক কান কেটে তারা উদযাপন করত। মাঝে মধ্যে তারা তার চোখ উপরে ফেলে দিয়ে বিজয়ের উল্লাস উদযাপন করত। গর্ভবতী কোন নারী ধরা পরলে তার পেট কেটে বাচ্চা বাহির করে হত্যা করত নবজাতককে। সামান্য কিছুকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ বাধিয়ে দিত। একবার এক লোকের উট কুয়া থেকে পানি পান করেছে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ বছর যুদ্ধ হয়েছিল।
ধর্মীয় বিশ্বাসঃ তারা মুলত পৌত্তলিক ছিল। তারা কাবা ঘরে ৩৬০ টি মুর্তি প্রতিস্থাপন করেছিল। প্রতিদিন তারা নতুন একটা মুর্তির পূজা করত।৩৬০ দিনে তাদের বছর ছিল। প্রতিদিন একটা করে পূজা করত।
আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময় মক্কায় কোন সামাজিক আইন ছিলনা। যা ছিল তা মুলত অনাচার, রাহাজানি, খুন,ছিনতাই, ধর্ষণ, জুয়া,মদ,নারীর প্রতি অন্যায়, কন্যা শিশুকে জীবন্ত মাটিতে পুতে ফেলার মত ঘটনা। তাদের নৈতিকতা এতো নিচে নেমে গিয়েছিল যে নিজের কুকর্মের বর্ণনা বীরত্বের সহিত বন্ধু বান্ধবদের সাথে বর্ণনা করত।
তখন মক্কায় চলত গোত্র প্রধানের শাসন। যাকে শেখ প্রথা বলা হয়। শেখের প্রতি ছিল তাদের অগাধ আনুগত্য। শেখের যেকোনো সিদ্ধান্ত তাঁরা মাথা পেতে নিতো। আর সেই গোত্র প্রধানরাই ছিল সকল মন্দ কাজের মূল হোতা।
তখনকার দিনের সামাজিক ন্যায়বোধ এতো নিচে নেমে গিয়েছিল যে, তারা পুত্র সন্তান লাভের আশায় স্বামীর অনুমতিক্রমে অন্য পুরুষের সাথে রাত্রি যাপন করত।
মক্কার লোকের ততকালীন বিশ্বের তিলনায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। যেমন তাদের সাহিত্য, ব্যবসায় এবং যুদ্ধ কৌশল। তারা আথিতেয়তায় ছিল বিশ্ব সেরা। তাদের আথিতিয়তার কাহিনি সকল দেশের মানুষ জানে।
তারা মনে করত তাদের বীরত্বের প্রতিক তলোয়ার ও অতিথি আপ্যায়ন।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে মক্কার আইয়ামে জাহিলিয়াতের।
কোন মন্তব্য নেই